পোস্ট বার দেখা হয়েছে
"উফ্ কি যে হবে!ডেলি মৃত্যুর হার বেড়েই চলছে। এতবার করে বলা হচ্ছে 'স্টে হোম, স্টে সেফ' কিন্তু মানুষের কোন হেলদোল আছে!কতদিন যে এরম চলবে..! অফিসটা খুললে বাঁচি। "
একরাশ বিরক্তিতে টিভির রিমোটটা ছুঁড়ে তরতর করে ছাদে উঠে যায় হিয়া।
মেয়ের এহেন আচরন এই 'লকডাউন'এ প্রায় প্রতিদিন ই সহ্য করতে হচ্ছে পরমা দেবীকে। কর্পোরেট ফার্মের উচ্চপদস্থ কর্মচারী হিয়া। আজ চার বছর হলো হিয়া আর 'সমীক'এর বিবাহবিচ্ছেদ ঘটেছে। তখন থেকেই বিধবা 'পরমা'দেবী, মেয়ে 'হিয়া' ও একমাত্র নাতনি 'অনু' তিনজনেই পরস্পরের রক্ষক। পরমাদেবীর স্বামী ছিলেন বেশ নামকরা ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। তাই বাড়ি- গাড়ী কোনকিছুরই খামতি ছিলোনা তাদের সংসারে।
তবে 'ইনডিপেনডেন্ট' হয়ে ওঠার খেলাটা হয়তো 'জুয়া'র থেকেও মারাত্মক। জিততে জিততে কোথায় যে থামতে হয়, সে খেয়াল কারো থাকেনা। স্বাভাবিকভাবেই হিয়ার সাথেও এর অন্যথা হয়নি।
মেয়েকে কিছু বলতে গেলেই মাকে যথারীতি মুখঝামটানি খেতে হয়।..."বাবার টাকা তোমার মা, আই ক্যান টেক কেয়ার অফ মাই ডটার."
রবিবারেও ঘরে মন টেকেনা হিয়ার। পরমাদেবী যদি মুখ ফসকে বলেন ও কখনো,... "মেয়েটা যে তোকে একদম কাছে পায়না রে হিয়া! " হিয়ার রূঢ় জবাব,,, "ওকে বুঝতে হবে দ্যাট আই অ্যাম আ সিঙ্গেল মাদার. ওসব আদিখ্যেতা করলে আমার চলবেনা।"
এই উত্তরের পর আর পরমাদেবী বলে উঠতে পারেননি কখনোই যে "শুধু অনু নয়, তোর মার ও যে তোকে দরকার রে হিয়া। "
তাই 'লকডাউন' এ জনজীবন বিপর্যস্ত হলেও, পরমাদেবীর দিন কিন্তু কাটছে পরমানন্দেই।
কতদিন পর মা-মেয়ে একসাথে খেতে বসে, কতদিন পর মেয়েকে সারাটাদিন চোখের সামনে দেখতে পান, এ কি কম পাওনা! ইদানীং ওই ছোট্ট অনুর মধ্যেই পরমাদেবী তাঁর হারিয়ে যাওয়া হিয়াকে খুঁজে বেড়ান।
*****************
খানিকক্ষণ পর মাথা ঠাণ্ডা করে ছাদ থেকে নেমে আসে হিয়া। "আজ আমার কোন কল নেই মা আজ অনুকে আমি সব করিয়ে দেব।"
মেয়েকে ব্রাশ করিয়ে টেবিলে এনেই আপেল কেটে খাওয়াতে যায়।
"একি!একি! ওর অ্যাসিডিটি হবেতো! সকালে ও দুধ চকোজ খায়। ছাড় আমি খাওয়াচ্ছি। "
দুপা পিছিয়ে এক অদ্ভুত ঈর্ষার নজরে মা আর মেয়েকে দেখে হিয়া। ব্রেকফাস্ট সেরেই ছোট্ট অনু 'দিদুয়া'র আঁচল ধরে ঢুকে পড়ে রান্নাঘরে। হিয়াকে কোন সুযোগ ই দেয়না সে নিজের কাছে ঘেঁষার।
"হিয়া.... কইরে যা ওকে নিয়ে যা। স্নান করিয়ে ওই গোলাপী,কাঁধে ফিতে বাঁধা,ওই জামাটা পরিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে দে দেখি।"
মেয়ের পোশাক নির্ধারণ ও যেন সে করতে পারবেনা, মুখে কিছু না বললেও অন্তরে গর্জে ওঠে হিয়া। হিড়হিড় করে টানতে টানতে মেয়েকে নিয়ে বাথরুমে ঢোকে হিয়া। হঠাৎ ই পরমাদেবীর কানে আসে অনুর আর্তনাদ।
"কি হলো রে... "
"জানিনা। বাথটবে বসাতেই নাকে কান্না শুরু। অসহ্য।"
"তুই বেরিয়ে আয় আমি করিয়ে দিচ্ছি। তোর ধাত পেয়েছে ও, বড্ড শীতকাতুরে, এখনও কাঁচাপাকা জলে স্নান করাতে হয়। তুই যা গিয়ে নিজের কাজ কর। "
সকাল থেকেই নিজের মেয়েকে কেমন পরপর অনুভব করছে হিয়া। তবে কি সে কিছুই জানেনা নিজের সন্তানের ব্যপারে!
মেয়েকে নিয়ে সন্ধ্যেবেলা কম্পিউটারে গেম খেলতে বসালে, সে কিন্তু দিদুয়ার আঁচল নিয়েই 'টুকি-টুকি' খেলতে ব্যস্ত।
অনেক রাত জেগে অফিসের কাজ করে বলে আলাদা ঘরে শোয় হিয়া। তবে আজ মা আর মেয়ের সাথে এক বিছানায় শোবে বলে বালিশ হাতে ভিক্ষুকের মতো কাঁচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে হিয়া।
"ওমা... তুই আজ এখানে শুবি? আয় আয় আজ আমি আমার দুই পরীকে একটা পরীর গল্প শোনাব।"
হাততালি দিয়ে ওঠে অনু। নিজ অজান্তেই কখন যেন হিয়াও মুখে একরাশ উচ্ছ্বাস নিয়ে সেই ছোটবেলার মতই হাততালি দিয়ে ওঠে।
সত্যি তো কতদিন মায়ের কাছে গল্প শোনা হয়না!
মায়ের সামনের চুলগুলো কত সাদা হয়ে গেছে! কই আগে কখনো খেয়াল করেনিতো হিয়া! তাহলে কি তার অগোচরেই মায়ের একটু একটু করে বার্ধক্য প্রাপ্তি ঘটছে! চোখ আবছা হয়ে আসে হিয়ার। আজ নিজের খোলস থেকে বেরিয়ে মাকে জিগ্গেস করেই ফেলে,
"মা, তোমার ইচ্ছে করেনা আমার সাথে গল্প করতে?"
"করলে কি করব! আমার ইচ্ছের মূল্য আছে তোর কাছে? এখনতো অনুর মাঝেই আমি তোকে খুঁজে পাই, তাই হয়তো তেমনভাবে তোকে মিস করিনা। নে ঘুমো , নয়তো অনু ঘুম থেকে উঠে পড়লে মহাভারত শুরু হবে কিন্তু।"
গলায় একটা নোনতা ঢোক গিলে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে শুতে গিয়েই জীবনের তৃতীয় ধাক্কাটার সম্মুখীন হলো হিয়া।
প্রথম ধাক্কা, যখন তার পিতৃবিয়োগ ঘটে।
দ্বিতীয়, যখন অন্তঃসত্ত্বা হিয়া তার ভালোবাসার মানুষটাকে ছেড়ে সন্তানের মুখ চেয়ে চিরতরে বেরিয়ে আসে। সমীক এই সন্তান চায়নি, তার ইচ্ছে ছিলো আরো কিছুদিন হিয়াকে শুধু নিজের করে উপভোগ করার। কিন্তু সেই দিন 'মা' হওয়ার যোগ্য দায়িত্ব পালন করেছিলো হিয়া।
আর আজ তৃতীয় ধাক্কা। যে সন্তানের কথা ভেবে তার সেপারেট হওয়ার সিদ্ধান্ত, আজ সেই সন্তান ই মায়ের হাত সরিয়ে তার আদরের দিদুয়ার দিকে ফিরে গলা জড়িয়ে শোয়। বালিশটা আঁকড়ে মুখ চেপে চুপচাপ শুয়ে থাকে হিয়া।
এত বড় চাকরি, নিজের কেনা গাড়ী-ফ্ল্যাট এগুলো আজ যেন হঠাৎ ই মূল্যহীন লাগছে তার। শুধু মনে হচ্ছে তার থেকে বড় ভিখিরি আর বোধহয় কেউ নেই। এ এক অদ্ভূত যন্ত্রণা, সব পেয়েও না পাওয়ার অনুভূতি, যা ভাষায় প্রকাশ করা দায়।
পরেরদিন সকালে ব্রেকফাস্ট টেবিলে পরমাদেবী বলে উঠলেন, "ওই দ্যাখ 'লকডাউন' এর মেয়াদ আরো বাড়ল। সত্যি দেশটা যে কবে সুস্থ হবে!"
কিন্তু আজ এই খবরে মেয়ের মুখে যেন রামধনু দেখতে পেলেন পরমাদেবী। মেয়ে তার বরাবরই চাপা স্বভাবের তাই মুখ ফুটে কিছুই বলেনা কোনদিন, কিন্তু উনি তো মা, তাই তাঁর চোখকে ফাঁকি দেওয়া অত সহজ নয়।
মুঠোফোনটা বেজে উঠতেই আজ আর খাবার ছেড়ে উঠলোনা হিয়া। কথোপকথনের ধারায় বোঝা গেল দিল্লি থেকে 'বস'এর ফোন।
"থ্যাংকস সার্, বাট আই ডোন্ট নীড দিজ প্রমোশন.
অ্যাকচুয়ালী সার্ মাই মাদার এন্ড মাই ডটার,দে নীড মি. দিজ ইজ নট দ্যাট মাচ ইজি টু ডিনাই দিজ অপুরচুনিটি, বাট দিজ টাইম আই অ্যাম হেল্পলেস.
হোপ,ইউ গেট মাই পয়েন্ট সার্."
ফোনটা রেখেই হিয়া ও পরমাদেবী দুজনেই পরস্পরের কাছে একরাশ জলে ভেজা চোখকে আড়াল করলো।
অনুর মুখে আলতো ভাবে দুধ-চকোজ টা দিয়ে পিঠে দুবার হালকা হাতের চাপড় দিয়ে মাকে বলে উঠলো হিয়া,
"কি এইভাবেই হজম করাও তো তোমার অনুকে?"
পরমাদেবীও হিয়ার পিঠে আদর মাখা হাত বুলিয়ে প্রত্যুত্তর দিলেন,
"নাঃ আমার অনু নাঃ,আমার অনুর মাঝে ফিরে পাওয়া হিয়াকে।"
মা কে জড়িয়ে ধরে ছোট্ট অনুর মতই ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে হিয়া।
"মা আর কিছুদিন চাকরি করে একটু স্টেবল্ হই, তারপর একটা নিজস্ব বিজনেস শুরু করব। যা লাভ হয় হবে,আমাদের ঠিকই চলে যাবে। ছুটতে ছুটতে আমি ক্লান্ত মা। এবার অনুকে সময় দিতে চাই, তোমাকে সময় দিতে চাই।
আমি বুঝেছি মা জীবনে অর্থই সব নয়, কাছের মানুষের সান্নিধ্যের থেকে মূল্যবান আর কিচ্ছু হয়না। আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম, এ আমার সেই 'অনু' যাকে ঘিরে আমার এতো লড়াই। সাফল্য পেতে পেতে লড়াই এর মূল উদ্দেশ্যটার থেকেই তো দূরে সরে গিয়েছিলাম।"
চোখে নিরন্তর অশ্রু বহন করে হিয়াকে জাপটে ধরে পরমাদেবী ঈশ্বর কে স্মরণ করে বলে উঠলেন,
"কত মানুষের দুর্দিন চলছে ঠাকুর, তবু যে আজ বড় স্বার্থপরের মতো তোমায় ধন্যবাদ জানাতে ইচ্ছে করছে! আজ যে কত বছর পর আমি আমার হিয়াকে আবার নতুন করে ফিরে পেলাম।
আমার দোষ নিওনা ঠাকুর, ক্ষমা করে দিও আমায়।। "

2 মন্তব্যসমূহ
খুব সুন্দর
উত্তরমুছুনবেশ ভালো ।
উত্তরমুছুন