বীরাঙ্গনা মাতঙ্গিনী হাজরা: এক নির্ভীক আত্মত্যাগের মহাকাব্য।। মৃণাল কান্তি পণ্ডিত




পোস্ট বার দেখা হয়েছে


ভূমিকা:-
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বর্ণালী ইতিহাসে যে ক'জন নারী নিজেদের রক্তে স্বাধীনতার সোপান গড়ে তুলেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম উজ্জ্বল এক নক্ষত্র হলেন মাতঙ্গিনী হাজরা । ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের শৃঙ্খল থেকে মাতৃভূমিকে মুক্ত করতে মেদিনীপুরের এই সাধারণ, দরিদ্র ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন নারী যে অসামান্য শৌর্য প্রদর্শন করেছিলেন, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। ১৯৪২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সাম্রাজ্যবাদী পুলিশের বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়ে তিনি মেদিনীপুরের প্রথম 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলনের শহীদ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন ।

প্রারম্ভিক জীবন ও সামাজিক চেতনা:-
১৮৬৯ সালের ১৯ অক্টোবর মেদিনীপুরের তমলুকের কাছাকাছি হোগলা গ্রামে এক অত্যন্ত দরিদ্র কৃষক পরিবারে মাতঙ্গিনী মাইতির (বিবাহোত্তর হাজরা) জন্ম হয়। দারিদ্র্যের কারণে বাল্যকালে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাওয়ার সুযোগ তাঁর ঘটেনি। মাত্র ১২ বছর বয়সে এক প্রৌঢ় বিপত্নীক ত্রিলোচন হাজরার সাথে তাঁর বিয়ে হয় এবং মাত্র ১৮ বছর বয়সেই তিনি নিঃসন্তান অবস্থায় বিধবা হন।
অকাল বৈধব্যের পর তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমাজসেবামূলক কাজে বিলিয়ে দেন। বিশেষ করে তৎকালীন সময়ে সমাজে পিছিয়ে পড়া এবং অস্পৃশ্য মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং মেদিনীপুরে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া বসন্ত রোগের (Smallpox) রোগীদের নিজের হাতে সেবা-শুশ্রূষা করে তিনি স্থানীয় মানুষের কাছে এক গভীর শ্রদ্ধার আসন লাভ করেন।

জাতীয় আন্দোলনে প্রবেশ ও 'গান্ধীবুড়ি' হয়ে ওঠা:-
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় থেকেই তিনি জাতীয়তাবাদী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হতে শুরু করেন । তবে ১৯৩২ সালে ৬২ বছর বয়সে তিনি মহাত্মা গান্ধীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

আইন অমান্য ও লবণ সত্যাগ্রহ:- 
১৯৩২ সালে মেদিনীপুরে লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনের সময় তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং লবণ আইন অমান্য করার অপরাধে গ্রেপ্তার হন । 

চৌকিদারি ট্যাক্স বন্ধের আন্দোলন:- 
কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তিনি ব্রিটিশ সরকারের অন্যায় 'চৌকিদারি ট্যাক্স' বয়কটের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন এবং পুনরায় ৬ মাসের জন্য বহরমপুর কারাগারে বন্দি থাকেন।

আদালতে পতাকা উত্তোলন:- 
১৯৩৩ সালে তমলুক আদালতের কঠোর পুলিশি পাহারা এড়িয়ে তিনি চতুরতার সাথে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং আদালতের ছাদে উঠে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে ব্রিটিশ গভর্নর জন অ্যান্ডারসনের উদ্দেশ্যে কালো পতাকা প্রদর্শন করেন।
দুর্বল দৃষ্টিশক্তি সত্ত্বেও চরকায় খাদি সুতো কাটা এবং গান্ধীর অহিংস নীতিকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করার কারণে স্থানীয় মানুষ তাঁকে ভালোবেসে 'গান্ধীবুড়ি' (Old Lady Gandhi) বলে ডাকতেন। 

ঐতিহাসিক ২৯ সেপ্টেম্বর ও রক্তঝরা তমলুক অভিযান:-
১৯৪২ সালের 'ভারত ছাড়ো আন্দোলন' মেদিনীপুরে এক বৈপ্লবিক রূপ ধারণ করেছিল। মেদিনীপুর থেকে ব্রিটিশ শাসন সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করে একটি স্বাধীন 'তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার' প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলনকারীরা তমলুক থানা ও সরকারি অফিসগুলো দখল করার পরিকল্পনা করেন।
২৯ সেপ্টেম্বর এই উদ্দেশ্যে গঠিত 'সমর পরিষদ'-এর (War Council) অধীনে 'বিদ্যুৎ বাহিনী'র পক্ষ থেকে পাঁচটি বিশাল মিছিল তমলুক থানার দিকে অগ্রসর হয়। যার মধ্যে একটি প্রধান মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন ৭৩ বছর বয়সী বীরাঙ্গনা মাতঙ্গিনী হাজরা, যেখানে প্রায় ৬,০০০ আন্দোলনকারী (যাঁদের বড় অংশই ছিলেন নারী) শামিল হয়েছিলেন।
শহরের উপকণ্ঠে মিছিলটি পৌঁছালে ব্রিটিশ ফৌজদারি আদালতের উত্তর দিকে পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে মিছিল ছত্রভঙ্গ করার নির্দেশ দেয়। কিন্তু অকুতোভয় মাতঙ্গিনী হাজরা সেই আদেশ অমান্য করে সহযোদ্ধাদের পিছনে রেখে নিজেই মিছিলের সামনে এগিয়ে যান এবং পুলিশের কাছে জনতার ওপর গুলি না চালানোর জন্য মানবিক আবেদন জানান। 

সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ ও অমরত্ব:-
মাতঙ্গিনীর এই সাহসিকতায় ক্ষিপ্ত হয়ে ব্রিটিশ পুলিশ নির্মমভাবে গুলি চালানো শুরু করে। তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের মুখপত্র 'বিপ্লবী' পত্রিকার বিবরণ অনুযায়ী:
*১. প্রথম দফায় গুলি সরাসরি তাঁর হাতে এসে লাগে। তিনি দমেননি, একহাতে পতাকা শক্ত করে ধরে এগিয়ে যান।
*২. দ্বিতীয় বুলেটে তাঁর অন্য হাতটি জখম হয়।
*৩. চূড়ান্ত দফায় একটি বুলেট তাঁর কপাল ভেদ করে চলে যায়।
রক্তে ভেসে যাচ্ছিল তাঁর শরীর, কিন্তু মৃত্যুর ঠিক পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তিনি হাতের তেরঙা পতাকাকে মাটিতে পড়তে দেননি, শক্ত মুঠিতে তা উঁচিয়ে ধরে রেখেছিলেন। শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার সময়ও তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছিল স্বাধীন ভারতের মহামন্ত্র—'বন্দেমাতরম্' । 

উত্তরাধিকার ও মূল্যায়ন:-
মাতঙ্গিনী হাজরার এই আত্মবলিদান মেদিনীপুরের বিপ্লবীদের মধ্যে দাবানলের মতো আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল, যার ফলশ্রুতিতে মেদিনীপুরে দীর্ঘকাল স্থায়ী স্বাধীন 'তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার' গঠিত হতে পেরেছিল। ১৯৭৭ সালে স্বাধীন ভারতে কলকাতার রেড রোডের কাছে তাঁর প্রথম ব্রোঞ্জের মূর্তি স্থাপন করা হয়। এছাড়া ২০০২ সালে ভারত সরকার তাঁর স্মরণে একটি বিশেষ ডাকটিকিট প্রকাশ করে।
আজ তাঁর এই আত্মবলিদান দিবসে সমগ্র জাতি এই বীর জননীকে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে, দেশপ্রেমের জন্য কোনো বয়স বা প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতার প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন কেবল একটি অদম্য ও নির্ভীক হৃদয়ের। 
 বীরাঙ্গনা মাতঙ্গিনী হাজরা অমর রহে।

তাঁর স্মরণে, তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে আমার নিম্নোক্ত কবিতা:-

#শিরোনাম:-অমর বীরাঙ্গনা মাতঙ্গিনী
#কলমে:-মৃণাল কান্তি পণ্ডিত 

বয়সের ভারে নোয়েনি যে শির, বুকে ছিল অসীম বল,
মাতৃভূমির মুক্তিসাধনে মেদিনীপুর চঞ্চল।
হাতে ছিল তাঁর স্বদেশের ধ্বজা, চোখে স্বাধীনতা-আশা,
বুলেটের মুখে ফুটেছিল শুধু— দেশের গভীর ভাষা।
তিয়াত্তরের জীর্ণ শরীর, প্রাণ ভরা যৌবন,
দেশের ডাকে যে সঁপে দিয়েছিল নিজের তনু ও মন।
ধন্য হলো গো মেদিনীপুরের তমলুক পুণ্যভূমি,
ইতিহাসের পাতায় অমর মাতঙ্গিনী হাজরা তুমি।
ঝরেছে রক্ত, পড়েনি পতাকা, আকাশ ছুঁয়েছে নাম,
'গান্ধীবুড়ি'র চরণে জানাই শতকোটি প্রণাম।
মৃত্যুর মাঝে জীবন পেয়েছে তোমার সে বলিদান,
বাঙালির বুকে চিরকাল রবে তোমার গৌরবগান।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ