পোস্ট বার দেখা হয়েছে
সকালবেলাটা কুয়াশার পাতলা চাদরে মোড়ানো। গঙ্গার বুকে সেই কুয়াশা যেন অলিখিত কোনো কবিতা লিখে চলেছে। চাঁদুপুর ঘাটে বসে আছে দশরথ মাঝি। গায়ের রং নদীর পলির মতো, গায়ে পুরোনো এক গামছা, চোখদুটো শান্ত অথচ গভীর, যেন শত নদীর স্মৃতি তার মধ্যে জমে আছে। সে একজন সাধারণ মাঝি হলেও তার জীবন এক নিরুচ্চারিত মহাকাব্য। পূর্বপুরুষেরা যেমন গঙ্গার বুক চিরে মানুষ পার করেছেন, তেমনি সেও সেই উত্তরাধিকারে জীবন কাটিয়ে চলেছে। তার বাবা ধনঞ্জয় মাঝি নাকি বলতেন, “নদী যদি রোজ বদলায়, মাঝিও তো রোজ শেখে নতুন করে ভেসে থাকতে।” দশরথের কাছে গঙ্গা শুধুই রুটি-রুজির পথ নয়। গঙ্গা তার মা, সাথি, ঈশ্বর। ঝড়-জল-বৃষ্টি, রোদ্দুর—কিছুতেই সে পিছু হটে না। রোজ সকালে নৌকার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, “চল মা, আজও পার করিয়ে দিই কিছু মুখ, কিছু জীবন।” তার একমাত্র সহচরী, মেয়ে লক্ষ্মী। মা-বিহীন সেই কিশোরী আজ তরুণী, চোখে স্বপ্ন আর মুখে সাহস। দশরথ জানে, লক্ষ্মীর স্বপ্ন বড়—সে পড়াশোনা করে শহরের কলেজে। কিন্তু দারিদ্র্য যেন বালির বাঁধের মতো, কখন কীভাবে ভেঙে পড়ে, কেউ জানে না। একদিন ভোররাতে, নদী যেন আরও কুয়াশায় ঘুমন্ত। দশরথ তার নৌকা নিয়ে দাঁড়িয়ে, এমন সময় এক যুবক উঠে পড়ল—কাঁধে ব্যাগ, চুল ভেজা, চোখে একরাশ দৃঢ়তা।
দশরথ জিজ্ঞেস করল, “কোথায় যাবেন বাবু?”
— “ওপারের কলেজে… আজ জীবনের বড় পরীক্ষা।”
পরদিনও এল ছেলেটি, পরপর কয়েকদিন। নৌকায় উঠতে উঠতে তার নাম জানা গেল—শুভ্র। লক্ষ্মীর সহপাঠী। একদিন সন্ধ্যায় সে দশরথের কাছে এসে চুপ করে বসে। তারপর বলে, “কাকু, আমি লক্ষ্মীকে ভালোবাসি। পড়াশোনার পরে ভালো চাকরি করে ওকে নিয়ে সংসার করতে চাই।” দশরথ তখন গঙ্গার দিকে তাকিয়ে ছিল। ঢেউয়ের শব্দ যেন কোনো পুরনো স্মৃতির বীণা বাজায়। সে জানে তার ঘরে পিতৃসূত্রে কিছুই নেই দেওয়ার মতো—না জমি, না ধন। কিন্তু সে লক্ষ্মীর চোখে দেখেছে এক রোদের মতো দৃপ্তি, শুভ্রর চোখে এক নদীর মতো আন্তরিকতা। সে নিচের দিকে তাকালো। বলল, “নাও পার করব, বাবু। তবে লক্ষ্মীর জীবন-নৌকাটাও যেন নিরাপদে পৌঁছায়।” তারপর কেটে যায় কয়েকটি বছর। শহরে চাকরি পায় লক্ষ্মী ও শুভ্র। বাবাকে দেখতে মাঝে মাঝে আসে, নতুন মোবাইলে কথা বলে। কিন্তু দশরথ আজও প্রতিদিন সেই পুরনো নৌকাটা নিয়ে নামে নদীতে।
পাড়ার ছেলেরা বলে, “কাকা, এই বয়সে কেন এত কষ্ট?”
দশরথ শুধু হাসে। বলে, “এই নাওটা কেবল কাঠ নয়, এ যে আমার আত্মা। গঙ্গা ছাড়া আমি নেই, আর আমি ছাড়া নাওটা কাঁধ পাবে কোথায়?” গঙ্গার বুকে সূর্য পড়ে। দশরথ মাঝি আবার নৌকায় পা রাখে। ঢেউয়ের ফাঁকে ফাঁকে ভেসে ওঠে তার জীবনের ছবি—ধনঞ্জয় মাঝির গলা, লক্ষ্মীর হাসি, শুভ্রর শ্রদ্ধা। আর সেই ছবি গঙ্গার জলে মিশে যায়, যেমন মাঝির জীবন মিশে গেছে নদীর স্রোতে।

0 মন্তব্যসমূহ