শ্রদ্ধার্ঘ্য - ডিরোজিও / জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়




পোস্ট বার দেখা হয়েছে

তিনি এসেছিলেন—

সময়ের বুক চিরে, প্রশ্নচিহ্ন হয়ে,

একটি জ্বলন্ত বিদ্রোহ হয়ে।


চারপাশে যখন অন্ধ কুসংস্কারের নাগপাশ, যেখানে প্রশ্ন মানেই অপরাধ, চিন্তা মানেই বিদ্রোহ—

সেই অন্ধকারেই

তিনি জ্বালিয়েছিলেন প্রদীপ।


হেনরি ভিভিয়ান ডিরোজিও—

শুধু একটি নাম নয়,

একটি জাগরণ।


এন্টালির পদ্মপুকুর থেকে

যে  শিশুর পথচলা শুরু

সে জানত না—

তার কলম একদিন

সময়ের বিরুদ্ধে হয়ে উঠবে  শাণিত অস্ত্র। 


পিতা ফ্রান্সিস ডিরোজিও একজন ইউরেশিয়ান, 

মা সোফিয়া জনশন, ভারতীয়।

পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। কোন ভাই বোনই অবশ্য বেশি দিন বাঁচেননি।


শৈশবে মায়ের শূন্যতা,

জীবনের কঠোরতা

সব পেরিয়ে

তিনি খুঁজে নিলেন 

জ্ঞান, যুক্তি আর স্বাধীনতার পথ।


মাত্র ছয় বছর বয়সে ভর্তি হল ধর্মতলা একাডেমিতে। সে সময় যানবাহনের সুব্যবস্থা না থাকায় পায়ে হেঁটেই স্কুলে যেত ছেলেটি।

শিক্ষক হিসেবে পেল ডেভিড ড্রামন্ড নামে এক স্বাধীনচেতা প্রগতিপন্থী স্কচম্যানকে ।  ১৪ বছর বয়সে বিদ্যালয় ত্যাগ করে পারিবারিক ব্যবসার কাজে ছেলেটি চলে গেল ভাগলপুর।


ডেভিড ড্রামন্ডের হাত ধরে

সে শিখল—

শিক্ষা মানে শুধু মুখস্থ নয়,

শিক্ষা শেখায় প্রশ্ন করতে,

শিক্ষা শেখায়, মুক্তমনা হতে।


ঘড়ি ব্যবসায়ী ডেভিড হেয়ারের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হলো হিন্দু কলেজ। মাত্র ১৭ বছর বয়সে হিন্দু কলেজে যোগদান। তিনি পড়াতেন ইতিহাস,

কিন্তু জাগিয়ে তুলতেন ভবিষ্যৎ।

তিনি শেখাতেন সাহিত্য,

কিন্তু গড়ে তুলতেন মানুষ।

চুম্বকের মতো আকর্ষণ—

ছাত্ররা ভিড় জমাতো তাঁর চারপাশে,

কারণ তারা খুঁজে পেত

শুধু একজন শিক্ষক নয়,

একজন মুক্তির পথপ্রদর্শক।



শিবনাথ শাস্ত্রী লিখেছেন -' চুম্বক যেমন লৌহকে আকর্ষণ করে তেমনি তিনিও অন্যান্য শ্রেণীর বালকদিগকে আকর্ষণ করতেন। এরূপ অদ্ভুত আকর্ষণ শিক্ষক- ছাত্রের এরূপ সম্বন্ধ কেহ কখনো দেখে নাই। '


ডিরোজিও বলতেন - সত্যের জন্য বাঁচা, সত্যের জন্য মরা। 

তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়ার সমান্তরালে বেড়ে চলছিল শত্রুতা।


তাঁর কিছু অতি উৎসাহী ছাত্ররা পথে-ঘাটে হিন্দু পুরোহিতদের উত্ত্যক্ত করত। তারা পুরনো কুসংস্কার  নিয়ে পথে-ঘাটে  বিদ্রুপ করতো। 

শোনা যায়, গরুর হাড় তারা রেখে দিয়ে আসতো ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের ঠিকানায়।

স্বভাবতই এসবের অভিঘাত গিয়ে পড়তো সমাজের বুকে।


তাঁর অনুগামীদের মধ্যে ছিলেন রামতনু লাহিড়ী,  রাধানাথ শিকদার, প্যারীচাঁদ মিত্র, কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, শিবচন্দ্র দেব, রসিক লাল মল্লিক, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, অমৃত লাল মিত্র প্রমূখ


ছোটবেলায় ময়দানে ক্রিকেট খেলত বন্ধুদের সঙ্গে, ঘোড়ায় চড়া ছিল ডিরোজিওর প্রিয় শখ। 


মানিকতলার এক সভাঘরে কখনো উঠত বিতর্কের ঝড়।

“একাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন”—

যেখানে জন্ম নিত যুক্তির সাহস,

প্রশ্নের অধিকার।

সেখানেই একদিন গড়ে উঠল

“ইয়ং বেঙ্গল”।

একদল তরুণ, যারা ভয় পায়নি,

যারা মাথা নোয়ায়নি।

অনেকে  যুক্ত হয়েছিলেন এই ইয়ং বেঙ্গল সোসাইটিতে।


 ডিরোজিও বলেছিলেন—

“চিন্তা করো, নিজেকে জানো,

ভাঙো সব অন্ধ শৃঙ্খল।”

কিন্তু চিরাচরিত সমাজ?

সে তো ভয় পায় আলোকে।

তাই ষড়যন্ত্র, অপবাদ,

আর শেষে—

তাঁকে একদিন বিদায় নিতে হলো 

হিন্দু কলেজ থেকে। 


তাঁর বিরুদ্ধে কলেজ কর্তৃপক্ষ অভিযোগ এনেছিল - 

তিনি ছাত্রদের ঈশ্বর বিশ্বাসে আঘাত এনেছেন। 

তিনি মা-বাবার অবাধ্য হতে ছাত্রদের ক্রমাগত প্ররোচিত করছেন। 

ভাই বোনের বিয়ে এরকম নিষিদ্ধ বিষয় নিয়ে তিনি ছাত্রদের উৎসাহিত করছেন।


কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, অভিভাবকরা চাইছেন না ছেলেদের কলেজে পাঠাতে।  ক্রমশ ছাত্র কমে যাচ্ছে কলেজের।


আত্মপক্ষ সমর্থনের কোন সুযোগ না দিয়ে কলেজ পরিচালন সমিতি ভোটাভুটিতে তাঁকে একতরফাভাবে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন।

যদিও পরে এক চিঠিতে তিনি তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন।


জানা যায়, চাকরি হারানোর পর একবার শোভাবাজার রাজবাড়ীর আমন্ত্রণে একমাত্র ছোট বোনের হাত ধরে গিয়েছিলেন তিনি। 

সেই আপ্যায়ন উৎসবে অপমানে অপমানে জর্জরিত করে তাঁকে অভুক্ত অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়। 

তাঁর অপরাধ ছিল -  তিনি নাকি সতী হতে চাওয়া এক নারীকে আশ্রয় দিয়েছিলেন।


ডিরোজিওর কর্মজীবন ছিল 

মাত্র ৬ বছর।

এতটুকু সময়েই

সৃষ্টি করলেন নতুন যুগ।


চরম দারিদ্র্য ও কলেরা রোগে মাত্র ২৩ বছর বয়সে থেমে গেল জীবন।


আজও প্রতিটি প্রশ্নে,

যুক্তিতে, প্রতিটি স্বাধীন চিন্তায়—

বেঁচে আছেন  ডিরোজিও।


দুটি কাব্যগ্রন্থের প্রণেতা যেন আজও বলেন— “দেখো, তোমাদের মন ফুটছে ফুলের মতো, বন্ধন ভেঙে

আলোয় ছড়িয়ে পড়ছে।”


হে ডিরোজিও,

তুমি শুধু ইতিহাস নও—

তুমি এক জাগরণ।

তুমি শিখিয়েছ—

শিক্ষা মানে আলোকবর্তিকা।

শিক্ষা মানে যুক্তির কোষ্ঠী পাথরে বিচার করে, সত্যকে গ্রহণ করা।

শিক্ষা মানে স্বাধীনতা, জাতীয়তাবাদের উন্মেষ।


প্রয়াণের পর জীবন্ত কিংবদন্তি, ডিরোজিওর স্থান হয়নি পার্ক স্ট্রিটের মূল  খ্রিস্টান সমাধিক্ষেত্রে। 

বেশ কিছুটা দূরে তাঁকে অবহেলায় সমাধিস্থ করা হয়।


আজও 

যখন অন্ধকার ঘনিয়ে আসে

আমরা খুঁজি—

তোমার সেই দীপ্ত চোখ,

সেই অগ্নিময় উচ্চারণ।

ছাত্র বৎসল সেই প্রসারিত হৃদয়। 


তুমি আছো,

যেখানে প্রশ্ন আছে,

যেখানে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তীব্র।


ক্ষণজন্মা তুমি, সময় শরীরে আজও বেঁচে আছো যুক্তি ও মুক্তচিন্তার বার্তাবাহী রূপে।

সংস্কার ও আলোরথের চিরন্তন সারথি হয়ে।


----------------------------------------

রচনাকাল - ১৭ এপ্রিল ২০২৬ 

কলকাতা ৩০

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ