পোস্ট বার দেখা হয়েছে
‘পদিপিসির বর্মিবাক্স’, ‘টংলিং’, ‘হলদে পাখির পালক’, ‘গুপীর গুপ্তখাতা’, ‘মাকু’ বাঙালি আজও ভুলতে পারে না। বাঙালির ছেলেবেলাকে তিনি তাঁর সাহিত্য দিয়ে জীবনের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে গেঁথে দিয়েছেন।
তিনি লীলা মজুমদার
জন্ম : ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯০৮
মৃত্যু : ৫ এপ্রিল ২০০৭
সাহিত্য সংস্কৃতি প্রিয় বাঙালির ছেলেবেলাকে রাঙিয়ে দিয়েছেন তিনি।
শৈশবের শিলং শহরের বাস, সে-শহরের বেড়ে ওঠার দিনগুলো তাঁর পিছু ছাড়েনি কোনও দিনও। তিনি ছেড়ে এসেছেন সে-শহর, হয়ে গিয়েছেন কলকাতার, খানিকটা শান্তিনিকেতনেরও বটে। কিন্তু ভ্রাম্যমাণ দীর্ঘায়ু জীবনে পাহাড়-ঘেরা ছোট্ট সাহেবি কেতার শহরটিকে বরাবর মনে রেখে দিয়েছেন তিনি।
‘পাহাড়ের ঢালের ওপর বাড়ি। গেট দিয়ে ঢুকে কাঁকড় বিছানো পথ দিয়ে নেমে বারান্দায় পৌঁছতে হত। একহারা লম্বা বাংলো, সামনে টানা বারান্দা, তার কাঠের রেলিং। বাড়ির তিনদিক ঘিরে বৃষ্টির জল যাবার জন্য নালা কাটা। তার ওপর দুটি চ্যাপ্টা পাথর ফেলা। তার ওপর দিয়ে বারান্দায় উঠতে হয়। বারান্দার ছাদ থেকে তারের বেড়ায় অর্কিড ফুল ঝুলত। তাদের তলায় সবুজ কাঠের বাক্সে জেরেনিয়ম ফুল ফুটত। লোকে এমন বাড়ি স্বপ্নে দেখে।’
এই ছিল শিলং-এ ছোট্ট লীলা আর তার দাদা-দিদির স্বপ্নের বাড়ি ‘হাই উইন্ডস’। ভাড়া নিয়ে সপরিবার এই বাড়িতেই কর্মসূত্রে আট বছর কাটিয়েছিলেন বাবা প্রমদারঞ্জন রায়, ১৯১১ থেকে ১৯১৯। সেই আট বছরে লীলার মনে তৈরি হয়ে যায় রূপকথার রাজ্যের এক নিজস্ব ছক, সারাজীবন যার নকশা বুনে গিয়েছেন তিনি।
তাঁর লেখাতেই রয়েছে :
"শিলং পাহাড়ে থাকতাম, সরল বনের মধ্যে হাওয়া দিলে সোঁ সোঁ শব্দ হত। ঠিক যেন লুকনো কথা বলে দিচ্ছে। দুটো পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে ঝোড়ো হাওয়া বইলে গোঁ গোঁ শব্দ হত। মনে হত ওইখানে কোনও গোপন জায়গায় শেকল দিয়ে দৈত্য বাঁধা আছে, ছাড়াবার চেষ্টা করছে। পাহাড়ি আয়ারাও গল্প বলত। সে সব দুঃখের গল্প, হারানোর গল্প, না পাওয়ার গল্প, কষ্টের গল্প। শুনে কান্না পেত।"
লীলা মজুমদারের এই দুর্লভ ‘বাল্যদৃষ্টি’র কথা উল্লেখ করে গিয়েছেন রাজশেখর বসু থেকে আরও অনেকেই।
লীলা মজুমদারের সাহিত্যে যে বাল্যদৃষ্টি, তার সূচনা হয়েছিল উপেন্দ্রকিশোরের ‘সন্দেশ’-এর হাত ধরে। সদ্য ছাপা ‘সন্দেশ’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যাটি তিনি উপেন্দ্রকিশোরের হাতেই দেখেছিলেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো। সেই স্মৃতি তিনি কোনও দিনও ভুলতে পারেননি। ১২ বছর বয়সে শিলং থেকে কলকাতায় আসার পর সুকুমার রায় তাঁকে দিয়ে জীবনের প্রথম গল্প ‘লক্ষ্মীছেলে’ লিখিয়ে নিয়েছিলেন ‘সন্দেশ’-এর জন্য। বড়দা সুকুমার, বড়দি সুখলতা, মেজদি পুণ্যলতা, মণিদা সুবিনয়ের মতো মানু্ষের প্রভাব ক্রমশ তাঁকে যথার্থ ‘সন্দেশী’ করে তুলেছিল।
১০০ গড়পার রোডের বাড়িতে ইউ রায় অ্যান্ড কোং-এর ছাপাখানা ও অফিস ছিল। ওই বাড়িই ছিল উপেন্দ্রকিশোরের পরিবারের আস্তানা। শিলং থেকে এসে লীলার পরিবার প্রথমে সেই বাড়িতে থাকতে শুরু করে।
তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা লরেটো কনভেন্ট স্কুল, শিলং থেকে হয় তারপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি নিয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর ইংরাজি পরীক্ষায় তিনি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়েছিলেন।
গোঁড়া ব্রাহ্ম পিতা প্রমদারঞ্জন রায়ের অমতে বিয়ে করলেন হার্ভার্ড ফেরত দন্ত চিকিৎসক সুধীরকুমার মজুমদারকে। ব্রাহ্ম-হিন্দুর এই বিয়েকে কেন্দ্র করে জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ বাবার সঙ্গে বিচ্ছেদ হল লীলার। কিন্তু পাশে পেলেন পিতৃতুল্য আরেক মহীরুহ স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকে।
*লীলা রায় হলেন লীলা মজুমদার*।
সুকুমার রায় ছিলেন লীলার জীবনে ঈশ্বরতুল্য। লীলাকে সারা জীবন বোধ হয় লালন করেছেন সুকুমারই। মৃত্যুর পরও।
এক দিন হঠাৎ কবি কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় এলেন তাঁর ‘রংমশাল’ পত্রিকার জন্য একটি কিশোর উপন্যাস লেখার অনুরোধ নিয়ে। তখন লীলার মনে হল, ‘এ আবার কেমন কথা? উপন্যাস লিখেছি নাকি কখনো?’ তবু রাতে সেই কথা ভাবতে ভাবতে ঝপ করে একটা গল্প জন্মাল। লেখা হয়েছিল ‘পদিপিসির বর্মিবাক্স’।
এর কয়েক বছর পরে ১৯৪৭ সালে এক দিন মেট্রো সিনেমার সামনে ‘মানিক অর্থাৎ সত্যজিৎ বলল, “আমায় তোমার সব ছোট গল্পগুলো দেবে? বই হবে।” ‘বদ্যিনাথের বড়ি’র সব গল্প ও আরো কিছু গল্প নিয়ে গেল মানিক। সিগনেট প্রেস থেকে বেরিয়েছিল ‘দিনদুপুরে’ বইটি ১৯৪৮ সালে। আর ঐ একটি বই দিয়েই চিরকালের মতো বাংলা সাহিত্যের বিপদসঙ্কুল পাথুরে পথে সেই যে একটু দাঁড়াবার জায়গা পেয়ে গেলাম, তার থেকে আর নামিনি।’
১৯৫৬ সালে লীলা কলকাতা বেতারের চাকরিতে যোগ দেন। পরবর্তী সাত বছর আকাশবাণীতে ‘মহিলা মহল’ অনুষ্ঠানে তাঁর ‘ঠাকুমার চিঠি’, ‘ইষ্ট কুটুম’-এর গল্প যথেষ্ট জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। ‘গল্পদাদুর আসর’-এ পঠিত হয় ‘হলদে পাখির পালক’ ও ‘টাকার গাছ’। অভিনীত হয় ‘বক বধ পালা’ নাটক। লেখেন ‘লঙ্কাদহন পালা’।
এই সময়েই লেখা হয় তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ লেখাগুলি। ছোট গল্প, নাটক, উপকথা, জীবনী সাহিত্য ও আরও অনেক কিছু দিয়ে তিনি বাঙলির ছেলেবেলাকে ভরিয়ে দেন।
শতায়ু লীলা সারা জীবন ধরে যত লেখা লিখেছেন, তার সব ক’টির হদিস পাওয়া যায় না বলে জানিয়েছেন তাঁর জীবনীকার, ভাইপো প্রসাদরঞ্জন রায়। তাঁর হিসেব মতো লীলা মজুমদারের মোট ২৮৯টি বইয়ের উল্লেখ সম্ভব হয়েছে।
পুরস্কার পেয়েছেন অঢেল। ভারত সরকারের শিশু সাহিত্য পুরস্কার, আনন্দ পুরস্কার, সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার, রবীন্দ্র পুরস্কার, বিদ্যাসাগর পুরস্কার, ভুবনেশ্বরী পদক, ভুবনমোহিনী দাসী সুবর্ণ পদক, দেশিকোত্তম, ডি-লিট প্রমুখ।
১৯৭৫ সাল থেকে তিনি পাকাপাকি ভাবে শান্তিনিকেতনে থাকতে শুরু করেন।
সেখানেই ২০০৭ সালের ৫ই এপ্রিল পাড়ি দেন তাঁর রূপকথার দেশে।
আমাদের সক্কলকার ঠাকুমাকে আসলে তো লীলা মজুমদারের মতোই দেখতে। যাবার আগে আমাদের প্রত্যেকের ঘুমের পাশে, বিছানার মাথার কাছে তিনি টাঙিয়ে রেখে গিয়েছেন তাঁর সেই ঝুলি, যা থেকে আজও আশ্চর্য সব গল্প বেরিয়ে আসে আর ঘুম পাড়িয়ে দেয় আমাদের।

0 মন্তব্যসমূহ