পোস্ট বার দেখা হয়েছে


 

 # কবিতা 

 


প্রতুল / উত্তম কুমার দাস



                              ‌(১)


জীবন দর্শনের এঁটো বাসনে আজ পান্তাভাত সংরক্ষণ করেছে সভ্যতা।


পরিশ্রমে ক্লান্ত সমাজের অন্তর্বাস

আজ ঘেমো আঁশটে গন্ধে ভরে গেছে........


পান্তার থালায় এক অভুক্ত ক্ষুধা!


নারীবাদী পুরুষের দল আজ পান্তা খোঁজে গরম ভাতের হাড়িতে।


পান্তার উপকারিতা বুঝেছে সমাজ.....


এটুকু গল্প সবাই জানে!


বাকিটা পরিণত........


                              (২)


ধর্ষিত সমাজের বুক থেকে যখন আঁচলটা খসে পড়ে........

                তখন একটা ভুল নোটিফিকেশন আসে।

হরফ গুলো চেনা হলেও


সত্যতা যাচাইয়ের পথ টা আলাদা.....

      সকলেই এক হাঁড়ি ফুটন্ত চাল থেকে দুটো ভাত তুলে নেয়!


     ‌‌ ‌ কিন্তু মন-মস্তিষ্ক আর বিশ্বাসের রকমফের গুলো ওপারে বন্দী।


              তাই দুই ঠ্যাং ফাক করে দাঁড়ালেই      আউশের গাছগুলোকে মনে হয় যোনির ফাটল।


                                   (৩)


সব উত্তর গুলো হারিয়ে গেছে 

                                বোঝা না বোঝার মাঝে!


সে এঁটো বাসন হোক বা ফসল ঝরে যাওয়া

                             আউশের ক্ষেত........…...


মৌলিক প্রবাহ গুলো সব গ্রন্থিবিশেষ!


তাই স্রোতের ছবি তুলতে যাওয়া যেমন পাগলামি

ঠিক তেমনি এক পাগলামি বিধাতার ছবি আঁকা!


রোদের নাভিশ্বাস থেকে শব এর মুক্তির কান্না

পর্যন্ত সবটাই একটা কল্পনার সন্নিবেশ................


বাস্তবটা শুধু স্বপ্নদোষের প্রতুলতা।



     ---------------×----------



 স্মৃতিমেদুরতা / পিয়ালী সরকার

 


আচ্ছা , তুমি কি বোঝো  --- 

তোমার পায়ে পায়ে অনুসরণ করা

প্রতিটি মুহূর্ত 

কেমন

অমরত্বের দাবীদার ?

মনে আছে তোমার .... সে বার... সেই যে ওই বাঁধের ওপর ----- নদীর ধার থেকে ফেরার পথে -----

শালিক-পায়ের-পড়ন্ত-বেলায় , সামান্য একটি পর্ণচ্ছায় কুটির আল্হাদিত করেছিল কেমন ? 

কী পরম আকুলতায় বলেছিলাম ... 

এমন একটা পাতায় ছাওয়া কুটির , সামনে বহতা নদী আর আমি ... তোমার চিরবিরহিনী রাধিকা , 

দেবে আমাকে উপহার সামনের জন্মদিনে ? 

তুমি তখন মেঘ দেখছিলে ঈশান কোণে .... রাখাল বালক সত্যিই 

সে সময় ঘাটকিনারে বাঁধা গরুর গলার 

ঘন্টি-দড়ি ধরে টেনে , গোয়ালে ভরছিল ....


এরপর যখন ধূলোর ঝড় উঠল -- মনে পড়ে , কেমন করে দৌড়ে আমাকে হিঁচড়ে ঠেসেছিলে কৃষ্ণচূড়ার পুরুষ্ট কান্ডে ?

যখন এই বসন্তেও মোহনায় জাগল শ্রাবণ , তখন তো আমার বুকেও এল ভরা বর্ষা ---

তারপর .... তার ....পর  .... এতই অসাড় সে বৃষ্টি যে কৃষ্ণচূড়ার পাশে কখন তুমুল ফুলেল বকুল দাঁড়াল এসে , তাও বুঝিনি !


শুধু হুঁশ ফিরে এল তোমার আমাকে অপত্য স্নেহের আলিঙ্গনে : ফিসফিসিয়ে বলেছিলে ---

''এত কেন 

               কাঁদিস তুই মেয়ে ? 

জানিস না কি 

               বুক বেয়ে যে নদী যায় তার উৎস ...

        কিনারা ...

                মোহনা ... তিনটেতেই তুই ছেয়ে ?''


পাগলির ঠোঁটে চোখে মুখে বুকে তখন একবার শ্রাবণ তো আর একবার বসন্ত !


     ---------------×----------



*নীল অরণ্যে হরিনাভি* / অসীম দাস 



কেমন করে তোর চোখে চুপ জল ফড়িং 

বিষ বিকেলেও উঠছে বেজে ভৈঁরো বীণ 

তোর নদী ডাক শুনতে পেলো দূর হরিণ 

জিরানকাটের রস হয়েছিস , তুই জানিস ?


তোর গলাতেই সুর বেঁধেছে কোকিল গান 

ভাসতে ভাসতে তোর হাসিতে থামলো বান 

চুলের মেঘে জলপ্রপাত পথ হারান 

তোর অরণ্যে হরিনাভি , তুই জানিস ?


তোর ছায়াতে একশো সূর্য ঈগলু ছাদ 

অন্তঃমিলে জ্যোৎস্না বোনে চরকা চাঁদ 

জাগলে শরীর বৃন্তে কদম ,জন্ম সাধ

সেই শরীরে স্বপ্ন লিখি , তুই জানিস ?


     ---------------×----------



সন্ধ্যানদীর জল / জয়া




কতো অজানা পথ,মাঠ,ঘাট পেরিয়ে খুঁজি তোমায় বালুকা বেলার গানে। মনের দুচোখে তোমার জলছবি আঁকি চৈত্রের দহন বেলার সন্ধ্যায়, সন্ধ্যানদীর জলে। 


আমার তোমাকে মনে পড়লেই 

শুধুই কবিতা মনে পড়ে। 

কাজল কালো চোখে খুঁজেছি, 

তোমার সবকটি পঙক্তিমালায়। 

যেখানে তোমার সম্বল সাজিয়ে রাখো যতনে। 


তোমার প্রেম যেন দূর দেশের কোন দ্বীপবাসিনী। 

যেন সুদুর কোন সাইবেরিয়ার পরিযায়ী পাখি। 

খুঁজেছি তোমায় রাতের আকাশে। বসন্তের হাওয়ায়,ফিসফাস শিল্পকলায় ভিজে পাতার শরীরে। 


তোমার বলা কথারা ফেটে যাওয়া শিমুল বীজের তুলোর মতো আলতো হাওয়ায় কেন তবে জলভরা মেঘের মতো ভাসে? 


অনেক আঁকা বাঁকা পথ পেরিয়ে, বসে আছি তোমার দুঃখের পাশে। এই সন্ধ্যবেলায়, একটু তোমায় শুনবো বলে। 


কিছু বলো না, বরং শুনি তোমার না বলা কথার দীর্ঘশ্বাস! সন্ধ্যানদীর জলের স্রোতের মতো সময় বয়ে চলে। না বলা কথা, আর সকল না পাওয়া গুলো সম্বল হয়ে থাক আমার সন্ধ্যানদীর বুকে। 


সেখানে সন্ধ্যা নামলেই জোছনা ভরা আকাশ নেমে আসে সন্ধ্যানদীর জলে।


যখন তুমি কথা বলো,মনে হয় অনেক কথা বলা বাকি রয়ে গেছে। যখন তুমি কথা বলো না, তখন সবচেয়ে বেশি কথা হয় তোমারই সঙ্গে। 


তবুও যে কেন সন্ধ্যাবেলার সন্ধ্যানদীর জল কালো কাজলে টলটল করে।


     ---------------×----------



"জীবন-মৃত্যু" / রীতিশা পাল



বাষ্পরা ছায়া খোঁজে বুকের খাঁজে,

কুয়াশার প্রতিটি বিন্দুতে আমার সোহাগ ,

বিশ্বাসের কার্পেটে ঘোরতর সন্দেহ।

আলগা হচ্ছে...


ছাইয়ের গাদা ঢেকে ফেলেছে আস্ত সূর্য্যটাকে,

নখের কোটর থেকে উঁকি মারছে নক্ষত্র,

আকাশের বুকে পা এক মহাকাশচারীর,

সূর্য্যটাকে ছাইচাপাই থাকতে দিও,

নইলে প্রখর তাপে ঝলসে যাবে তুমিও,


এভাবেই পোড়া ছাই বাড়তে বাড়তে 

একদিন সীমান্ত টপকে চলে যেতে হবে...

যেমন একদিন বুকের সূর্য্যটাকে গিলেছিল জ্যোৎস্নার 

অহমিকা ।।


     ---------------×----------



# ছোটগল্প



রক্তমাখা পাঁউরুটি / বীরেন আচার্য্য



পুলিশভ‍্যানটা ঠিক সময়ে এসে পড়েছিল তাই , নইলে ... ভীড় সরিয়ে এগিয়ে যায় গোপাল দারোগা।  মাটিতে পড়ে একটি পনেরো ষোল বছরের ছেলে । জামা প‍্যান্ট ছেঁড়া  । মারের চোটে নাক মুখ দিয়ে গল্ গল্ করে রক্ত পড়ছে । 

পুলিশ আসতেই ভীড় ফাঁকা । 

ইস্ এমন ভাবে মেরেছে । এই একে তোল্ ভ‍্যানে ।  

গোপাল দারোগা দেখে ছেলেটির হাতের মুঠোয় একটা 

পাঁউরুটি ধরা । বুঝতে পারেন পাঁউরুটি চুরি করতে গিয়েই.....। 

 থানায় নিয়ে এসে ছেলেটির মুখে চোখে জলের ঝাপটা দেয় । এই সামন্ত ! একটা ডাক্তার ডেকে আনো ।

ছেলেটি মরে গেলে অনেক হ‍্যাপা। হয়তো রটে যাবে আমরাই পিটিয়ে মেরেছি । 

যাচ্ছি স‍্যর । 

দারোগা নিজেই  তুলো দিয়ে ওর নাক মুখের রক্ত মোছে। ইতিমধ‍্যে সামন্ত ডাক্তার নিয়ে এসেছে ।

ডাক্তার পরীক্ষা করেন । হুম্ । বেশ অনেক জনেই মেরেছে । আঘাত গুরুতর ।হাসপালে দিন । 

স‍্যর ! ছেলেটিকে এনে তো আচ্ছা গেড়োয় পড়া গেল । 

আঃ সামন্ত ! তুমি কি চাও ছেলেটি রাস্তায় মরে পড়ে থাকুক । 

ডাক্তার একটা ইনজেকশন করে । 

আপনারা একে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে দিন।  চলে যায় ডাক্তার । 

গোপাল দারোগা বিড়বিড় করে - কতটা অভাবে পড়লে তবে মানুষ চুরি করে । অথচ ছেলেটিকে দেখলে  ভদ্র ঘরের বলে মনে হয় । 

ওদিকে ছেলেটির যেন জ্ঞান ফেরে।কপালটা ধীরে ধীরে কোঁচকায়। অস্ফুট আওয়াজ - আঃ - আঃ - 

সামন্ত ! ছেলেটির জ্ঞান ফিরছে । 

আঃ মা - মাগো ! 

খোকা ! তোমার নাম কি? 

ছেলেটি তাকায় । নাক দিয়ে তখনও চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে । মুখটা বেশ ফোলা । কোনরকমে বলে - গোপাল। 

দারোগা চমকে উঠেও সামলে নেয় । গোপাল - 

আপন মনে হেসে ওঠে । 

ছেলেটি তখনও বলছে - জানি চুরি করা মহাপাপ । কিন্তু কি করবো । আজ দুদিন বাবা কিছু খায় নি। খুব অসুখ । আমরা তিন ভাই । আমিই বড় ।  মা ছোটভাইকে জন্ম দিয়েই মারা যায় । বাবা ই  আমাদের মা- বাবা। 

বাবা কি করেন ? 

কারখানায় কাজ করতো । সেই যে লকডাউনে বন্ধ হয়ে গেল আর খুললো না । 

তুই পড়াশুনা করিস্ ? 

এবারে মাধ‍্যমিক দিয়েছি । দারোগা বাবু আমি বাধ‍্য হয়েই চুরি করেছি । চাইলাম - কেউ দিল না। 

এযুগে চাইলে কেউ দেয় না রে ।  এখন তোকে হাসপাতালে যেতে হবে ? 

না দারোগাবাবু ! আমাকে জেলে দিন  । আমি চোর । তবে এই পাঁউরুটিটা আমার বাবাকে পৌঁছে দিন । বাবার খুব অসুখ । দুদিন খায় নি  । তবে বাবাকে বলবেন না আমি চুরি করেছি। তাহলে খাবে না। 

আমাকে মিথ‍্যে বলতে বলছিস্ ? 

সবাই যে বলে পুলিশ মিথ‍্যে বলে । মিথ‍্যে কেস দেয় । 

গোপাল দারোগার মুখে  দুঃখের হাসি। ছেলেটি হঠাৎ বুক চেপে ধরে গোঙাতে থাকে । 

গোপাল ! এই গোপাল ! 

সাড়া দেয় না গোপাল । সামন্ত - সামন্ত - এক্ষুণি এ্যাম্বুলেন্স- .......।

ছেলেটিকে নিয়ে সামন্ত ও দুজন কনস্টেবল হাসপাতালে চলে গেছে । অফিসে বসে ভাবলেশহীন গোপাল দারোগা ।  এমন সময় জিপ নিয়ে সাব ইনসপেক্টর অতীনবাবু দুজন সিভিক ভলেন্টিয়ার নিয়ে থানায় ঢোকে ।

স‍্যর আজকের কালেকশন - 

গোপাল দারোগা তাকায় । কিছু বলে না । 

স‍্যর মাত্র আঠারো হাজার সাতশো....

 গোপাল দারোগা হাসে । 

স‍্যর আপনি.......? 

এমন সময় ফোন আসে ।

হ‍্যালো - 

স‍্যর আমি সামন্ত বলছি হাসপাতাল থেকে - 

হ‍্যাঁ - হ‍্যাঁ বলো ! ছেলেটি ভালো আছে ? 

স‍্যর ছেলেটি - 

হ‍্যাঁ বলো - 

হার্টফেল করেছে । বুকে পেটে ভয়ানক আঘাত । 

গোপাল দারোগার হাত থেকে রিসিভারটা পড়ে যায় । 

হঠাৎ বাঘের মত গর্জন করে । শালাদের আমি কাঊকে ছাড়বো না। 

কারা স‍্যর ? 

আচ্ছা অতীনবাবু ! আমি কি বেঁচে আছি ? 

একি বলছেন স‍্যর ? 

আপনি ওই টাকাগুলো নিয়ে গোপাল রুদ্র'র বাবাকে খুঁজে বের করে দিয়ে আসুন । 

সামন্ত ফিরে আসে । পোস্টমর্টেম হবে স‍্যর । 

সামন্ত , অতীনবাবু  এই উর্দিটা পরেও অনেক খারাপ কাজ করেছি । আসুন না গোপালের মত সুবোধ বালকদের বাঁচিয়ে রাখার জন‍্য আমরা শপথ নিই । 

অতীনবাবু যেমন টাকা তুলছিলেন তেমনি তুলবেন । তবে আর নিজেদের জন‍্য নয় ।

চলুন-  গোপালের বাবাকে প্রথম খুঁজে বের করি । 

স‍্যর ! আমরা আপনার সাথে আছি । তবে আইন যারা হাতে তুলে নিয়েছিল তাদের শাস্তি দিতেই হবে । 

থানার মেঝেতে তখনও পড়ে সেই রক্তমাখা পাঁউরুটিটা।  গোপাল দারোগার কানে বাজে -

" এই পাঁউরুটিটা বাবাকে পৌঁছে দিন । বাবা দুদিন কিছুই খায় নি ................"।

গোপাল দারোগা বিড়বিড় করে ...

" গোপাল বড় সুবোধ বালক ছিল "।

- স‍্যর পাঁউরুটিটা সঙ্গে নেব ?


          ---------------×----------



ক্যানভাস / জয়া চক্রবর্তী সোমা 



আজকাল যা আঁকছি তাই সত্যি হয়ে যাচ্ছে।এই যেমন সপ্তাহখানেক আগে এক বৃদ্ধার পোর্ট্রেট আঁকলাম।আর তার পরেরদিন সকালেই বৌ এর চিৎকার চেঁচামেচি শুনে বাইরে গিয়ে দেখি সেই বুড়িটাই ভিক্ষে চাইতে এসেছে।বৌ তাকে দূর দূর করে তাড়াচ্ছে।একে তো আগে কখনও দেখিওনি।অথচ এই মুখটাই এঁকেছি।

আবার ধরুন আমার ছেলে মুকুলের একটা হাসিমুখ ছবি আঁকবো ভেবে আঁকছিলাম।হঠাৎ বাইরে বৃষ্টি শুরু হল।আমি ঝাঁট আসছে বলে আমার স্টুডিওর জানলা বন্ধ করে এসে দেখি আমাদের পোষা বেড়াল বিশ্রী কান্ড ঘটিয়েছে।এমন লাফ দিয়েছে যে ওর পা লেগে তুলিটা ছিটকে কালো কালিটা ছিটকে ছবিতে লেগেছে।অদ্ভুত ভাবে একটা রেখার এপার ওপারে ছেলের হাসিমুখের ছবিটা মনখারাপের  ছবি হয়ে গেছে।মনে হল ছবিটা যেন এক্ষুনি কেঁদে দেবে।আমারও মন খারাপ হয়ে গেল।শেষ করতে ইচ্ছে করল না ছবিটা।রেখে দিলাম।

বিকেলে বৌএর তর্জন গর্জন শুনে গিয়ে দেখি ছেলে ঠিক অবিকল ছবিটার মত মেঘলা মুখে তাকিয়ে আছে।স্কুলের পরীক্ষায় তৃতীয় হয়েছে।ফার্স্ট হতে পারে নি বলে মায়ের কোপের মুখে পরেছে।আমি বলতে গেলাম-"আহা! ও তো চেষ্টা করেছে।প্রাইজও এনেছে।তবে কেন বেচারাকে.." বৌ ঝংকার দিয়ে ওঠে-"শোন তোমার মত মিনমিনে ব্যাটাছেলে আমার দুচক্ষের বালাই।সংসারের কোন দিকে যেমন তাকাও না, মুস্টে মুস্টে গিলছো কুটছো আর পিন্ডির ছবি আঁকছ, তেমনই থাকো।আমার ছেলের পড়াশোনায় মাথা গলাবে না।ও তোমার মত বড়লোক শ্বশুরের ঘরজামাই হবে না।ওকে ব্যবসা সামলাতে হবে।তাই রেজাল্টটা আমার চাই।যাও এখান থেকে।যাও বলছি।" কানমাথা ঝাঁ ঝাঁ করে ওঠে। সত্যিই আমি বড়লোক শ্বশুরের ঘরজামাই।আমার শ্বশুরমশাই আমার বাবার বন্ধু ছিলেন।উনি জানতেন ওনার মেয়ের মত এমন ঝগড়াটে দজ্জাল কিঞ্চিৎ ছিটগ্রস্ত পাগলাটে মেয়ের সাথে যারই বিয়ে দেবেন তার বিয়ে টিকবে না।তাই আমাকেই কিনেছিলেন।

আমি শিল্পী হব।ছবি নিয়ে থাকবো। সে ছিল আমার মত হাভাতে ঘরের ছেলের কাছে স্বপ্ন। উনি আমার স্বপ্ন পূরণ করলেন, নিশ্চিত নিরাপদ জীবন দিলেন।সমাজে শিল্পী হিসেবে নাম হল।কিন্তু ওনার ঘরের চারদেওয়ালের ভিতরের আমার জীবনটা হয়ে গেল কেঁচোর মত।ওনার মেয়ের কেনা চাকর আমি।দাঁতে করে জুতো বইতে বললেও সেটা আমি করতে বাধ্য তা প্রতিমুহূর্তে মায়া মানে আমার স্ত্রী আমায় বুঝিয়ে দেয়। আমি তো ওর সব কথা শুনেই চলি।তাহলে ওর কিসের এত আক্রোশ আমার উপর? কেন এমন ব্যবহার করে? যখন ওর ইচ্ছে হয় বিছানায় ডেকে পাঠায়।ওকে সুখী করাটাও আমার কাজ।মিটে গেলে বিছানা থেকে দূর করে দিতে সময় নেয় না।আমি সব মেনে নিয়েছিলাম।নিজেকে বিক্রি করেছি।সুতরাং মেনে তো নিতেই হবে।ও ছাড়া যে সত্যিই আমার সমাজে কোন পরিচিতি কোন অস্তিত্ব নেই।ওর বাবা আমায় তৈরী করেছেন।মেয়েকে সুখী না রাখলে যা দিয়েছেন তা কেড়ে নিতেই বা কতক্ষণ।আমি তাই মেনেই নিয়েছিলাম।

কিন্তু আজকাল বড় অসহ্য বোধ হয়। আমার ছেলের সামনে যখন ও এরকম করে বলে।ছেলেকে আমি খুব ভালোবাসি।যদিও ওর উপর আমার কোন অধিকার নেই।ওর উপর সব অধিকার ওর মায়ের।ছেলের জন্য ওর মা পাগল।ভালোবাসাতেও যেমন দাবীতেও তেমন।ছেলেকে ও ওর সবটুকু মনোযোগ দেয় বলে শেষ বিন্দু অবধি নিংড়ে নিতে চায় ওর থেকে।সেটা রেজাল্টই হোক বা অনুগত্যই হোক।মাঝে মাঝে আমার কষ্ট হয় ওর জন্য।বেচারা চাপে চাপে থাকে।কিন্তু আমার বলার কোন অধিকার নেই কিছু।

তবু... তবু সব মেনে দাঁতে দাঁত চেপে কেঁচো হয়েই আছি।কিন্তু এখন যখন ওর মা ছেলের গায়ে হাত তোলে, সামান্য অপরাধে এলোপাথাড়ি মারতে মারতে গায়ে দাগ করে দেয় তখন মনে হয় ওকে মেরে ফেললে কেমন হয়।ওর মৃতমুখটা কল্পনা করে মনে মনে সুখ বোধ হয়। যদিও আমি জানি আমার মত কেঁচোর পক্ষে খুন করা অসম্ভব।

তুলি নিয়ে বিক্ষিপ্ত মনে ক্যানভাসে আঁচড় কাটছি।কানে আসছে ছেলের কান্না আর ওর মায়ের হিংস্র কথা।বদ্ধ পাগল একটা।বাপ জানতো বলেই আমাকে...হঠাৎ মনে হয় আচ্ছা ওকে যদি মেরে ফেলি? না না নিজে হাতে নয়,যদি ওর একটা মৃত ছবি আঁকি আমি? সেটাও কি সত্যি হবে?  না শান্ত সমাহিত মৃত্যু নয়।ও যেমন করে লোককে কষ্ট দেয়,ভয় দেখায়  ঠিক তেমন একটা যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু।কিন্তু কিভাবে? আমি ক্যানভাসে একের পর এক তুলির আঁচড় দিয়ে চলেছি।ওর বীভৎস মুখটা কল্পনা করছি।ও সিলিং থেকে ঝুলছে।ওর শাড়িটার আঁচল লুটোচ্ছে মাটিতে।ওর চোখ বিস্ফারিত। এক হাত জিভ বেরিয়ে আছে।চুলের অর্ধেক একটা চোখ ঢেকে দিয়েছে।মুখটা ঝুলে পরেছে বুকের উপর। ছবি শেষ হল।আঃ কি তৃপ্তি।আমার এই ছবি কি সত্যি হবে না? এখনও শয়তানীটা আমার ছেলেকে মারছে।কানে আসছে বলছে-"চুপ করে থাকবি না মুকুল।বল কি ভুল করেছিলি যে ম্যাথসে হান্ড্রেড হল না।আমি তো সব করিয়ে পাঠিয়েছিলাম। তাহলে কি ভুল করেছিস? ইচ্ছে করে ভুল করেছিস তাই না?মুকুল..চুপ করে থাকবি না।" 

শুধু প্রথম হতে পারে নি বলে এরকম অত্যাচার!কতটা পাগল হলে একটা মা এমন করতে পারে? অথচ এই সন্তানের জন্য নাকি ও পাগল।এই সন্তান ছাড়া ওর জীবনে নাকি আর কিচ্ছু নেই একথাই বলে বেড়ায় সবাইকে।হঠাৎ একটা ভারী কিছু উল্টে পরার শব্দ পেলাম।তারপর হঠাৎ সব কেমন চুপ হয়ে গেল।আমি কান খাড়া করলাম।মায়া মুকুলকে ডাকছে-"মুকুল এই মুকুল..মুকুল এই..কি রে ওঠ।কি রে.." কি হয়েছে? মুকুল কি জ্ঞান হারিয়েছে মার খেয়ে? 

আমি ছুটে গেলাম।চেয়ারটা উল্টে পরে আছে।তার পায়ার কাছে মুকুল।চোখ খোলা কিন্তু কোন দৃষ্টি নেই।কান দিয়ে ঘন লাল তরল গড়িয়ে যাচ্ছে...


আমার ছবিটা এবারেও সত্যি হয়েছে জানেন।মায়া ঠিক ওই ছবিটার মতই আত্মহত্যা করেছে।না করে আর কিই বা উপায় ছিল ওর।নিজের হাতে ছেলেকে মেরে ফেলেছে ও।চড় মেরেছিল।ধাক্কাটা সামলাতে না পেরে মুকুল পরে যায়।চেয়ারের কোনাটা বেকায়দায় মাথায় লেগে... সব  শেষ।কি করে মা হয়ে নিজেকে ক্ষমা করত ও।আর আমি? আমায় আজকাল পাগল বলে লোকে।যেদিন মুকুল চলে গেল সেদিনই তুলি ক্যানভাস রঙ সব জড়ো করে পুড়িয়ে দিয়েছি আমি।আর এখন রঙ তুলি দেখলেও আমি আতঙ্কে চিৎকার করে উঠি।কি জানি কখন নিয়তি কি আঁকিয়ে নেবে আমায় দিয়ে।



      ---------------×----------